রাস্তার কবিতা

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

বন্দনা করি
বন্দনা করি এদেশেরই অনার্য পিতার
শ্যাম চামড়ার শ্যামল মানুষ মাটি শ্যামলার,

খাঁটি মানুষ যারা ২ রক্তধারা দিয়েছে মিশায়ে
এদেশেরই মাটি জলে নওল নোনা বায়ে,

যারা মাটির ছেলে ২ কৃষক জেলে শ্রমিক সর্বহারা
এই জাতির রক্তে দিছে শক্ত শ্রমের ধারা,

যারা গাঁয়ে থাকে ২ গায়ে মাখে বৃষ্টি রোদের প্রেম
আষাঢ় মাসের কাদায় বোনে শস্য-সুখের হেম,

বোনে দুঃখ জরা ২ রক্ত-ঝরা জীবন যুদ্ধের গান,
যাদের হাড়ে মাংশে ফোটে আন্দোলনের ধান।

বাজান করতালি, ২ সবকে বলি. পদ্য আমার শুরু
প্রনতি জানাতাম যদি থাকতো কোনো গুরু

কিন্তু হতভাগ্য, ২ দুরারোগ্য ব্যারাম সারাদেশে
কোনো তথ্যে, কোনো পথ্যে সারে না সে-ব্যাধি।

দ্যাখো চতুর্দিকে, ২ নিচ্ছে শিখে ছেলে. বুড়ো. নারী,
তেল মালিশের নানা কৌশল নানা ছল-চাতুরি।

এবার সুদিন এলো, ২ পাওয়া গেল পানির নিচে গ্যাস,
সাগরে ভাই পাওয়া যাবে আরো তেলের রাশ।

বলো মারহাবা, ২ তেল পাইবা, পাইবা তেলের পা,
দরকার মতো সেই পায়েতে তেল লাগাইয়া যা।

কোনো চিন্তা নেই, ২ ধেই ধেই নাচো দিয়ে কাছা
মামা ভাগ্নে নাইবা র’লো আছে আইনের চাচা।

আমরা হাঁদা-হাবা, ২ মার বাবা বেঁধে হাত ও পা,
চিরকালই খাবো আমরা ফরেন লাঠির ঘা।

বড়ো কষ্ট মনে, ২ এ-অরন্যে বাঁচা ভীষন দায়
রাজার হাতি ছাইড়া দিছে সকল কিছু খায়,

কোনো বিচার হয় না, ২ আছে জানা আইনের সব ফাঁক,
আইন তৈরি করেন যারা তাদের সবি মাফ।

আহা বঙ্গদেশ, ২ রঙ্গ বেশ কতো রঙ্গের খেলা,
তন্ত্রে মন্ত্রে যুদ্ধ চলছে, চলছে শিল্প-মেলা।

আমরা চুনোপুঁটি, ২ গুটিশুটি থাকি ঘরের কোনে,
রুই বোয়ালের বড়ো বুদ্ধি বড়ো যে তার মানে।

তবু যেটুক বুঝি, ২ তাই পুঁজি, তা-ও হয় যে মিস্‌,
গাছপালা কাইটা ঢাকার বানাইছে প্যারিস!

বড়ো ভালো চিন্তা, ২ নাচো ধিতা, ধিতা ধিনা ধিনা,
বাংলাদেশে প্যারিস পেলে মজার নেই তো সীমা।

‘ওরা নষ্ট লোক, ২ করে শোক গেরাম গেরাম বোলে
বাংলাদেশকে ঢোকাবো ভাই রাজধানীর খোলে—’

বলেন চিন্তাবিদ, ২ দিকবিদিক জ্ঞানের মধ্যে পোকা,
নামের শেষে নানা হরফ মানুষকে দ্যায় ধোকা।

করে বুদ্ধি বন্টন, ২ হাতে লণ্ঠন, দিবালোকের চোর
ডলার রুবেল দিনার পেয়ে কাটে না আর ঘোর।

আমরা সবি জানি, ২ কতোখানি কারা কোথায় আছে,
কে কতোটা জলে. তলে. কে কতোটা গাছে।

কারা ছদ্মবেশী, ২ বাইরে দেশি, বিদেশি ভেতরে
সময় মতো মুখোশ খোলে, সময় মতো পরে।

এরাই মূল শত্রু, ২ পাপের গুরু সমাজের জীবানু,
মনের মধ্যে ক্ষত এদের বাইরে সুশ্রী তনু।

ভাইরে বিশ্বাস করো, ২ বুকে বড়ো ব্যথার আগুন জ্বলে,
আর্ত মানুষ পিষে ওরা সুখের দালান তোলে।

দেশে নানা শ্রেনী, ২ বাড়ায় গ্লানি, হিংসা ও বিদ্বেষ
সব কথার গোড়ার কথা বলছি আমি শেষ

মানুষ সচেতন হও, ২ মুখোশ হটাও, ভাঙো শ্রেনীভেদ
দেশের মাংশে পচন তারে করতে হবে ছেদ।

বাজাও খোল করতাল, ২ আর কতোকাল মুখোশ প’রে রবে,
বুকের স্বপ্ন বাজাও এবার জাগরনের রবে।

ফেরো নিজের ঘরে, ২ নিজ সংসারে স্বজনের উঠোনে,
সমান ভাবে ভাগ কোরে নাও বেঁচে থাকার মানে।

মানুষ কষ্টে আছে, ২ কষ্টে বাঁচে হাজার গ্রামের লোক,
স্বপ্নবিহীন জীবন তাদের হৃদয় ভরা শোক।

তাদের বন্দনা গাই, ২ বুকে সাজাই সময়ের ইতিহাস
এই জাতির আনন্দ. সুখ. দুঃখ. দীর্ঘশ্বাস।

পরাজয়ের গ্লানি, ২ টানছি ঘানি আজো জানি তার,
আলোর ঘায়ে খুললো না কেউ অন্ধকারের দ্বার।

ছিলো শক্ত পেশী, ২ যে বিশ্বাসী সমুন্নত হাত
ছিঁড়লো না সে রক্ত-চোষা অবিচারের রাত।

ছিলো নিজস্ব গান, ২ নিজের পরান, নিজের বাড়ি ঘর
মাল মশলা নিজের ছিলো নিজের কারিগর।

ছিলো নদীর ভাষা, ২ ভালোবাসা বেহুলার সাম্পান
তবু লখিন্দরে আজো পেলো না পরান।

যতো বিজ্ঞজনে, ২ আয়োজনে ব্যস্ত যে শহরে
নিজের সুখের ঘর গড়তে দুখী মাইষের হাড়ে।

তাদের বলি শোনো, ২ যদি কোনো না-করো উপায়
হাজার মানুষ ভাঙবে ও-সুখ হাজার হাতের ঘায়।

কোনো নিষ্কৃতি নাই, ২ আমি জানাই শোনো স্বার্থপর—
আর্ত মানুষ কেড়ে নেবে তাদের অধিকার।

তারা জেগে উঠছে, ২ ছুটে আসছে, বুকে সত্য আলো,
তাদের আগমনের বার্তা রুদ্র বইলা গেল।

আমার পদ্য শেষ, ২ এই দেশ, এ মাটির বাঙালি,
আমার ভালোবাসার অস্ত্রে সাহস ওঠে জ্বলি।

ওঠে রনবাদ্য, ২ যা আরাধ্য, প্রার্থনা যা মনে
সমস্ত আরতি আমার বিশ্বাসের চরনে –
তুমি শক্তি দিও।।