বাস্তুত্যাগ

[wpcode id="967"]
[wpcode id="2738"]

এই বাস্তুভিটায় আমার বাবার বসতি ছিলো, ছিলো আমার দাদা ও পূর্বসুরী চৌদ্দপুরুষের!

এই যে মাটি— এখানে মিশে আছে আমার শৈশব, আমার কৈশোরের পদচিহ্ন, তারুণ্যের দুরন্ত বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে যৌবনের প্রেম ও ভালোবাসার নিদারুণ কামনা-কাব্য।

এই যে আমার বাড়ি— তার চৌহদ্দির পেছনের কবরস্থানে মিশে আছে বংশলতার অস্থি-মাংস, ঠিক যেভাবে মাধবীর পূর্বপুরুষের দেহভস্ম-ছাই মিশে গেছে লক্ষ্যার শীতল জলে।

এই মাটি ও স্মৃতি চেতনায় ধারণ করে আমরা আশৈশব হতে চেয়েছি শুধুমাত্র মানুষ, বাঙালি এবং অসাম্প্রদায়িক বোধনে ঋদ্ধ একগুচ্ছ সাদা সাদা প্রিয় মানবিক আত্মা!

মাধবীর গোঁসাই খুড়ো রহমান জ্যাঠুর বন্ধু ছিলেন। আমি যখন কৈশোরের কাঁচামাটি, তখন মক্তবে যাওয়ার পথে সূর্য-নমস্কার ব্যায়ামের প্রাক্কালে গোঁসাই খুড়োর সাথে প্রায়শই দেখা হতো। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে তিনি বলতেন— মন দিয়ে পড়িস বাপজান, তোর সুর করে আরবি পড়া বেশ মিষ্টি লাগে। তারপর দেখা হয়নি অনেকদিন। শুনেছি খুড়ো আজ বেঁচে নেই।

গোঁসাই খুড়ো বেঁচে থাকলে দু’চোখে অবাক বিস্ময় ও কষ্টের আহুতি নিয়ে দেখতেন তাঁর সেই মিষ্টি সুর ততোধিক মিষ্টি সুরে ঘোষণা দিয়েই কেড়ে নিচ্ছে মিষ্টত্বের সর্বজনীন আবাহন।

মৌলবির ঘরে জন্ম নিয়েও আমি মানুষ, হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়েও আমরা মানুষ।

অথচ, রহিম চাচার মেয়ে খাদিজা, শীলপাড়ার পারিতোষ, বিদেশ-ফেরত অভিজিৎ, প্রাইমারি স্কুলের মিস আশালতা কিংবা সৈয়দবাড়ির আমি— আমরা গুটিকয়েক মানুষ যারা বেড়ে উঠেছি নারায়ণগঞ্জের উদিত অসাম্প্রদায়িক সূর্যের আলোয়, ঘুরে বেড়িয়েছি পঞ্চ বটের ছায়ায় বিশ্রাম শেষে বুড়িগঙ্গার জলে ভেজা নিজ নিজ ধর্ম চর্চার নগরে— তারা এখন এই নব্য-খর্জুর প্রেক্ষাপটে ধর্মগঞ্জের নিজস্ব কেউ নয়; সবাই বেমানান, অপাংক্তেয়, অনাহূত উপড়ে ফেলা আগাছা পরগাছা মাত্র!

এই বাংলার অশ্বত্থ-বট ফেলে খেজুরের গাছ এখন বোধিবৃক্ষ! পৌরাণিক গড়ুর-হুদহুদের ঠোঁটে কিংবা হনুমানের বুক চিড়ে সেজে ওঠে চেতনার রূপকথা! অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক হাওয়া-জলে বেড়ে ওঠা এই মানবিক মাটির সবুজ সন্তানেরা আগাছার মতো উপড়ে উপড়ে পড়ে। তবু্ও উটপাখির মতো মুখ লুকোনো আত্মবিস্মৃত স্বজাতি নির্লিপ্ত রয়ে যায়, ভোগের অপেক্ষায় থাকে স্বর্গলোভী দিকভ্রান্ত অজস্র মনুর সন্তান।

হায়, বাংলার মাটি আছে, বাঙালি মা আছে, বাঙালি পূর্বপুরুষ আছে, বাঙালিয়ানার স্মৃতি আছে। সব আছে, শুধু স্বস্তির ওম নেই, আলো নেই, উত্তরপুরুষের নিশ্চয়তা নেই!

এখন এই দাহকালে এসব স্মৃতির ওম আর ধূলোমাখা শেকড় ফেলে আমায় এবং আমাদের চলে যেতে হবে। এই যে মায়ের হাতে তিলতিল করে গড়ে ওঠা পালান, ধবলী গাই, মাচানের কুমড়ো, দেশি কুঁকড়া সব ফেলে চলে যেতে হবে।

আমি সব ছেড়ে চলে যাবো, আমি চলে যাবো…

শান্তির ধর্মে আজ অশান্তির বীজতলা
ভগবানের ধর্মে আজ ক্ষমতাই ভগবান
ঈশ্বরের ধর্মে আজ লোভই ঈশ্বর
অহিংসার ধর্মে আজ হিংসার রঙে কুঁচকে যাওয়া করতল

….আমি সব ছেড়ে চলে যাবো! চলে যাবো এই বাস্তুভিটা ছেড়ে, শ্যামল মরুভূমি ছেড়ে, শেকড় এবং মাটির স্মৃতি বুকে নিয়ে!