লো-প্রেশারের দাওয়াই

মানব সুরত

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

শ্যামলদা সাংবাদিক মানুষ। অনিয়ম, অযত্ন ও অতিশ্রমে স্বাস্থ্য যেনো শীতকালের শীর্ণ মগড়া নদী। ষাটোর্ধ্ব শরীরটাতে অন্য কোনো ব্যামো না থাকলেও লো-ব্লাডপ্রেশারটা তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।

সেদিন সকাল থেকে শ্যামলদার শরীরটা একটু বেশিই খারাপ ছিলো। তবুও কাজের তাগিদে বের হতে হলো। বিকেলে ইত্তেফাকে একটা জরুরি রিপোর্ট পাঠিয়ে নেত্রকোনা প্রেসক্লাব থেকে বের হতে হতেই টের পেলেন— সামথিং রং, সামথিং ইজ ভেরি রং।

উনি রিস্ক নিলেন না, পাশের ফার্মেসিতে গিয়ে ব্লাডপ্রেশার মাপালেন— প্রেশারের মারাত্মক অধঃপতন!

ঔষধের দোকানী অবাক হয়ে বললেন— আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কীভাবে! আপনার তো অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা। মাই গড! আপনার প্রেশার তো অনেক লো, ৪০/৬০! আমি একটা ঔষধ দিয়ে দিচ্ছি, এখুনি খেয়ে দ্রুত হাসপাতালে চলে যান।

শ্যামলদা মৃদু হেসে বললেন— নাহ, লাগবে না। এ আর এমন নতুন কিছু না। আমি বাসায়ই চলে যাচ্ছি। বাসায় গিয়ে কিছু খেয়ে-দেয়ে একটু ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

শ্যামলদা ফার্মেসি থেকে বের হয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠলেন। উনি রিকশায় বসেই টের পেলেন আজ মনে হয় ব্লাডপ্রেশারটা একটু বেশিই লো! ক্যামন যেন মাথা ঘুরাচ্ছে, ঘাড়ে ব্যথা, শিরাগুলো দপদপ করছে, শরীর খুব দুর্বল লাগছে, একটু বমিবমিভাবও আছে, দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে আসছে! তবে কী খারাপ কিছু হতে চলেছে ওনার সাথে! উনি হয়তো আর বাঁঁচবেন না, হয়তো আর কিছুক্ষণ মাত্র সময় হাতে আছে। উনি ভয় পেয়ে গেলেন। ওনার কান্না পাচ্ছে, আবার বেশ হাসিও পাচ্ছে। কিন্তু উনি কিছুই করতে পারছেন না।

সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছে। শ্যামলদার মনে ঝড় বইছে। মনে পড়ে গেলো প্রিয়-অপ্রিয় কতো মুখ, কতো স্মৃতি! ওনার মনে হলো উনি চলে যাচ্ছেন দূরে, বহু দূরে, তলিয়ে যাচ্ছেন গভীর কোনো ঘোরের ভেতর!

বরাবরের মতো এ সময়েও শ্যামলদার অবচেতন মন ও শরীরের পজিটিভ এনার্জি ওনার পাশে এসে দাঁড়ালো। ভেতরের উইলফোর্স ওনার সম্বিত ফেরানোর চেষ্টা করছে, সাহস যোগাচ্ছে— না না না শ্যামল, তুমি ঠিক আছো, তোমাকে ঠিক থাকতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে, জ্ঞান হারালে চলবে না। তুমি সাংবাদিক, তুমি ফাইটার। তুমি বঙ্গবন্ধুর নিউজ করেছো, ভাসানী হুজুরের নিউজ করেছো, মুক্তিযুদ্ধের নিউজ করেছো, মানিক মিয়ার সাথে কাজ করেছো, কতো উত্থান-পতন জেল-জুলুম রাজনীতির পালাবদল— সব দেখেছো তুমি! তুমি কখনো হার মানোনি, এবারও হার মানলে চলবে না। তুমি বেঁচে থাকবে, তোমাকে বাঁচতেই হবে….

হঠাৎ শ্যামলদার ফোনটি বেজে উঠলো। ফিচারফোনের পরিচিত রিংটোনের শব্দে সচকিত হয়ে উঠলেন তিনি। চমকে উঠে সম্বিত ফিরলো তাঁর, যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন অনেক অনেক দিন পরে। কাঁপা কাঁপা হাতে কলটি রিসিভ করে কানে লাগালেন ফোনটি।

— হ্যালো, শুনছো? তুমি কই?
শ্যামলদা বুঝতে পারলেন এটা ওনার স্ত্রীর কন্ঠ।
— হ্যাঁ, শুনছি, বলো। শোনো, আমার শরীরটা ভালো না, প্রেশার ফল করেছে। ৪০/৬০। আমি রিকশায়, বাসায় ফিরছি।
— হ্যাঁ, তা তো হবেই। কথা বললে তো আর শোনো না। অসুস্থ তো হবেই। ঠিক আছে, বাসায় এসো, খেয়েদেয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
— আচ্ছা।
— আর, শোনো, বাসায় মেহমান এসেছে। ফ্রিজে মুরগি ছাড়া আর কিছুই নেই। তুমি আসার সময় একটা ইলিশ, দু’/তিন কেজি খাসি, গয়নাথ থেকে দই, মিষ্টি আর লিটনের দোকান থেকে টুকটাক ফল নিয়ে এসো।

স্ত্রীর ফর্দ শুনে প্রমাদ গুণলেন তিনি। পকেটে বেশি টাকা নেই। এতো বাজার করবেন কীভাবে! তবুও বরাবরের মতোই ভাবলেশহীনভাবে বলে উঠলেন— আচ্ছা।

এদিকে ফোন রেখেই প্রচণ্ড টেনশনে পড়ে গেলেন শ্যামলদা, প্রায় তিন হাজার টাকার ঝক্কি। এতো টাকা দ্রুত ম্যানেজ করতে হবে এখনই। কিন্তু, কীভাবে— জানা নেই। ওনার টেনশন বাড়তে লাগলো। টেনশনে টেনশনে ওনার ব্লাডপ্রেশারও বাড়তে লাগলো।

প্রায় মিনিট খানেক পর উনি বুঝতে পারলেন যে উনি ভালো বোধ করছেন, শরীরটা একটু সুস্থ সুস্থ লাগছে। উনি বেশ অবাক হলেন! প্রচণ্ড টেনশনে ওনার ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গিয়ে লো-প্রেশার এখন নরমাল হয়ে গেছে! ওনার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। এ যাত্রায় উনি তাহলে বেঁচেই গেলেন। কিছুক্ষণ আগেও বিরক্তি উদ্রেককারী স্ত্রীর প্রতি মনে মনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন তিনি, কৃতজ্ঞতায় ন্যুব্জ হলেন ফের।

হায়, সংসার! আহা, জীবন!