“আইজকা অনেক রোদ, আগুনের লাহান! দরদর কইরা ঘামতাছি। কয়টা ট্যাকা বেশি দিয়েন, মামা!”
“আজ আকাশটা মেঘমেঘ, ভ্যাপসা গরম। একটু বাড়াইয়া টাড়াইয়া দিয়েন!”
“আইজ সকাল থেইক্কাই বিষ্টি, টানা ভিজতাছি। মনে অইতাছে ঠান্ডা লাইগগা যাইবো। ওষুধ কিনোনের লেইগা কিছু বাড়াইয়া দিয়েন, মামা!”
“আইজ অনেক ঠান্ডা, কেমন শীতডা পড়ছে, দেকছেন! শোইত্ত প্রবাহ, মামা। রিকশা চালাইয়াও গা’ডা গরম অইতাছে না। একটু পোষাইয়া দিয়েন!”
“অনেকক্ষণ ধইরা জামে বইসা আছি। আগে জানলে এদিকে খেপ নিতাম না। একটু পোষাইয়া দিয়েন,মামা!”
“রাস্তা এক্কেবারে ফকফকা। কত্তো তাড়াতাড়ি নিয়া আইলাম! একটু বাড়াইয়া দিয়েন। আপনারা না দিলে আমরা কইত্থেকা পামু?”
পরীবানু——
কয়ডা বেশি ট্যাকার লাইগা আর তুমারে পাওনের লাইগা আমার ছুতানাতার শেষ নাই! পেসেনজারের কাছে হাত পাইত্তা কয়টা বেশি ট্যাকা আর তুমার কাছে ভালবাসা— এর থেইকা বেশি কিছু চাই নাই কুনুদিন। তুমার লাইগা আমার অন্তরডা পুড়ায় বানু, মনে লয় রিশকার চেইন দিয়া তুমার মনডারে আমার মনডার লগে সারাক্ষণ বাইন্ধা রাখি। তুমার লাইগা আমার ভিতরডারে সাজাইছি অনেক যতন কইরা, যেমুনডা নতুন কুমিল্লা বডিরে নিজের মনের রঙ দিয়া সাজাইয়া তুলে গেরাজের মিস্ত্রী! আমার চিকন-চাকন ডাইন হাতডারে শক্ত কইরা যহন রিশকার বেইলডা বাজাই— ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং, তহন মনে অয় তুমারে ডাইকা ডাইকা কইতে থাকি আমাগো প্রেম-ভালবাসার কতা, আমাগো কষ্টের কতা, আমাগো আশার কতা! তহন যেন তুমারে কইয়া যাই তুমিই অইলা আমার জিনে-ধরা আন্ধার রাইতের পরী, আমার পুন্নিমার চান। মনে লয় তুমারে রিশকায় কইরা ঘরে লইয়া যাই, আদর সুহাগ করি, সুখের ঘর বান্ধি, হেরপর আমাগো যদি একটা মাইয়া অয়, মাইয়ার নাম রাখি— ময়না, সোহাগের ময়নাপাখি!
প্রিয়াংশু আমার——
আমি এক দুরন্ত রিকশাওয়ালা, ভালোবাসার রিকশা নিয়ে ছুটে বেড়াই ভাবনার অলি-গলি, তোমার বিচরণের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত। আমি আমার রিকশা এবং এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন বের হই তোমার পথে। আমি আনমনে গিয়ে দাঁড়াই তোমার বাড়ির সম্মুখের তেমাথায়। তুমি ভাবলেশহীন এগিয়ে আসো, কখনো উপেক্ষা করো, কখনো বেখেয়ালে উঠে বসো আমার রিকশায়। তখন তোমার সময় এবং তোমাকে বুকে নিয়ে আমার ভালোবাসা ছুটে চলে তোমার নিজস্ব গন্তব্যে।
এভাবেই দিন যায়, দিন আসে, পূর্ণ হয় যাপনের চক্র। এভাবেই পৃথিবীর সব ভূমি মুছে যায় ত্রিবেণী সঙ্গমে, জেগে ওঠে নতুন ত্রিভুবন— আমি, আমার রিকশা ও আমার একমাত্র কাঙ্ক্ষিত যাত্রী!
পথপ্রিয়া, এখন এ উষর আবেগের দাহকালে প্রেমের জমিন পুড়ে যায় কামনার উত্তাপে, বিশ্বাসের মোকাম— সে-তো দূরস্থ বিরান, ভালোবাসাও সম্ভোগে বন্দি! আর আমি শ্রম ও আকাঙ্ক্ষার যূথবদ্ধ সাধনায় এখনও বিভোর হই সুন্দর আগামীর স্বপ্নে, অথচ দিনশেষে অনিবার্য ফিরে আসে নিদারুণ অপ্রাপ্তি এবং সামর্থ্যের হাঁসফাঁস!
প্রিয়াংশু, এসো, আমি না হয় আমার রিকশা নিয়ে তোমার পথের সারথি হই, তোমায় গন্তব্যে পৌঁছে দিই! তুমি শুধু চিরন্তন যাত্রী হয়ো, সহযাত্রী হয়ো! আর, ভালোবাসাটা একটু বাড়াইয়া দিয়ো! একটু পোষাইয়া দিয়ো, প্রিয়তমা!

