হাঁসুলী বাঁকের ঘন জঙ্গলের মধ্যে রাত্রে কেউ শিস দিচ্ছে। দেবতা কি যক্ষ কি রক্ষ বোঝা যাচ্ছে না। সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কাহারেরা।
কোপাই নদীর প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় যে বিখ্যাত বাঁকটার নাম হাঁসুলী বাঁক—অর্থাৎ যে বাঁকটায় অত্যন্ত অল্প-পরিসরের মধ্যে নদী মোড় ফিরেছে, সেখানে নদীর চেহারা হয়েছে ঠিক হাঁসুলী গয়নার মত। বর্ষাকালে সবুজ মাটিকে বেড় দিয়ে পাহাড়িয়া কোপাইয়ের গিরিমাটিগোলা জলভরা নদীর বাঁকটিকে দেখে মনে হয়, শ্যামলা মেয়ের গলায় সোনার হাঁসুলী; কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে জল যখন পরিষ্কার সাদা হয়ে আসে—তখন মনে হয় রূপোর হাঁসুলী। এই জন্যে বাঁকটার নাম হাঁসুলী বাঁক। নদীর বেড়ের মধ্যে হাঁসুলী বাঁকে ঘন বাঁশবনে ঘেরা মোটমাট আড়াই শো বিঘা জমি নিয়ে মৌজাবাঁশবাঁদি, লাট্ জাঙলের অন্তর্গত। বাঁশবাঁদির উত্তরেই সামান্য খানিকটা ধানচাষের মাঠ পার হয়ে জাঙল গ্রাম। বাঁশবাঁদি ছোট গ্রাম; দুটি পুকুরের চারি পাড়ে ঘর-তিরিশেক কাহারদের বসতি। জাঙল গ্রামে ভদ্রলোকের সমাজ–কুমার-সদ্গোপ, চাষী-সদ্গোপ এবং গন্ধবণিকের বাস, এ ছাড়া নাপিতকুলও আছে এক ঘর, এবং তন্তুবায় দু ঘর। জাঙলের সীমানা বড়; হাঁসিল জমিই প্রায় তিন হাজার বিঘা, পতিতও অনেক–নীলকুঠির সাহেবদের সায়েবডাঙার পতিতই প্রায় তিন শো বিঘা ৷
সম্প্রতি জাঙল গ্রামের সদ্জাতির ভদ্রলোক বাবু মহাশয়েরা বেশ থানিকটা ভয়ার্ত হয়ে উঠেছেন। অল্প আড়াই শো বিঘা সীমানার বাঁশবাঁদি গ্রামের অর্থাৎ হাঁসুলী বাঁকের কাহারেরা বলছে— বাবু মশায়ের ‘তরাস’ পেয়েছেন। অর্থাৎ ত্ৰাস। পাবারই কথা। রাত্রে কেউ যেন শিস দিচ্ছে। দিনকয়েক শিস উঠেছিল জাঙল এবং বাঁশবাঁদির ঠিক মাঝখানে ওই হাঁসুলী বাঁকের পশ্চিম দিকের প্রথম বাঁকিতে—বেলগাছ এবং স্যাওড়া ঝোপে ভর্তি, জনসাধারণের কাছে মহাআশঙ্কার স্থান ব্রহ্মদৈত্যতলা থেকে। তারপর কয়েকদিন উঠেছে জাঙলের পূর্ব গায়ে কোপাইয়ের তীরের কুলকাটার জঙ্গল থেকে। তারপর কয়েকদিন শিস উঠেছিল আরও খানিকট। দূরে—ওই হাঁসুলী বাঁকের দিকে স’রে। এখন শিস উঠছে বাঁশবাদির বাশবনের মধ্যে কোনখান থেকে।
বাবুরা অনেক তদন্ত করেছেন। রাত্রে বন্দুকের আওয়াজ করেছেন, দু-একদিন লাঠিসোঁটা বন্দুক নিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে হৈ-চৈ করেছেন, খুব জোরালো হাতখানেক লম্বা টর্চের আলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারিদিক দেখেছেন, তবু কিছুরই সন্ধান হয় নাই। কিন্তু শিস সেই সমানেই বেজে চলেছে। ক্রোশখানেক দূরে থানা। সেখানেও খবর দেওয়া হয়েছে; ছোট দারোগাবাবুও এসেছিলেন দিন তিনেক রাত্রে, কিন্তু তিনিও কোন হদিস পান নাই। তবে নদীর ধারে ধারে শব্দটা ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা ঠিক। এইটাই তিনি সমস্ত শুনে ঠাওর ক’রে গিয়েছেন।
দারোগাবাবু পূর্ববঙ্গের লোক-তিনি বলে গিয়েছেন, নদীর ভিতর কোন একটা কিছু হচ্ছে। ‘নদীর ধারে বাস, ভাবনা বারো মাস।‘ ভাবেন, খানিকট ভাবেন। সন্ধান মিললে পর খবর দিবেন।
‘নদীর ধারে বাস, ভাবনা বার মাস’–কথাটা অবশ্য ডাকপুরুষের বচন–পুরুষানুক্রমে চলেও আসছে দেশে। সে কথা কখনও মিথ্যা নয়, কিন্তু দেশভেদে বচনেরও ভেদ হয়, তাই ওকথাটা হাঁসুলী বাঁকের বাঁশবাদির জাঙল গ্রামে ঠিক খাটে না। বাংলাদেশের এই অঞ্চলটাতেই খাটে না। সে হল বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল। জাঙল গ্রামের ঘোষ-বাড়ির এক ছেলে ব্যবসা করে। কলকাতায়। কয়লা বেচা-কেনা করে, আর করে পাটের কারবার। বাংলাদেশের সে অঞ্চল। ঘোষবাবু ঘুরে এসেছে। সে বলে-সে দেশই হল নদীর দেশ। জলে আর মাটিতে মাখামাখি। বারটি মাস ভরা নদী বইছে; জোয়ার আসছে, জল উছলে উঠে নদীর কিনারা ছাপিয়ে সবুজ মাঠের মধ্যে ছলছলিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে; জোয়ারের পর আসছে ভাটার পালা, তখন মাঠের জল আবার গিয়ে নামছে নদীতে; নদীর ভরা কিনারা খালি হয়ে কুল জাগছে। কিন্তু তাও কিনারা থেকে বড়জোর দু-আড়াই হাত; তার বেশি নামে না। সে নদীও কি এমন-তেমন, আর একটিদুটি? সে যেন গঙ্গা-যমুনার ধারা, অইথই করছে, থমথম করছে; এপার থেকে ওপর পারাপার করতে এ দেশের মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। আর সে ধারা কি একটি? কোথা দিয়ে কোন ধারা এসে মিশল, কোন ধারা কোথায় পৃথক হয়ে বেরিয়ে গেল—তার হিসাব নাই। সে যেন জলের ধারার সাতনরী হার,-হাঁসুলী নয়। নদীর বাঁকেরই কি সেখানে অন্ত আছে? ‘আঠার বঁকি’, ‘তিরিশ বঁকি’র বাঁকে বাঁকে নদীর চেহারা সেখানে বিচিত্র। দুধারে সুপারি। আর নারিকেল গাছঃ-সারি নয়—বাগিচা নয়-সে যেন অরণ্য। সঙ্গে আরও যে কত গাছ, কত লতা, কত ফুল, তা যে দেখে নাই সে কল্পনা করতে পারবে না। সে দেখে আশ মেটে না। ওই সব নারিকেল-সুপারির ঘন বনের মধ্য দিয়ে বড় নদী থেকে চলে গিয়েছে সরু সরু খাল, খালের পর খাল। সেই খালে চলেছে ছোট ছোট নৌকা। নারিকেল-সুপারির ছায়ার তলায় টিন আর বাঁশের পাশ দিয়ে তৈরি ঘরের ছোট ছোট গ্রাম লুকিয়ে আছে। সরু খালগুলি কোনো গাঁয়ের পাশ দিয়ে, কোনো গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে–গ্ৰাম থেকে গ্রামান্তরে। ও-দেশের ছোট নৌকোগুলি এ-দেশের গরুর গাড়ির মত। নৌকাতেই ফসল উঠছে ক্ষেত থেকে খামারে, খামার থেকে চলেছে হাটে-বাজারে, গঞ্জে-বন্দরে। ওই নৌকোতেই চলেছে। এ গায়ের মানুষ ও—গাঁয়ের কুটুমবাড়ি, বহুড়ি যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি, মেয়ে আসছে বাপের বাড়ি; মেলা-খেলায়। চলেছে ইয়ারবন্ধুর দল। চাষী চলেছে মাঠে-তাও চলেছে নৌকোতেই, কাস্তে নিয়ে লাঙল নিয়ে একাই চলে নৌকো বেয়ে। শরতের আকাশের ছায়াপথের মত আদি-অন্তহীন নদী, সেই নদীতে কলার মোচার মত ছোট্ট নৌকের মাথায় বসে-বাঁ হাতে ও বাঁ বগলে হাল ধরে, ডান হাতে আর ডান পায়ে বৈঠা চালিয়ে চলেছে। ঘোষের ছেলে শতমুখে সে দেশের কথা বলে ফুরিয়ে উঠতে পারে না। এ নদীর ধারে বাসা-ভাবনার কথাই বটে। ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ঘোষের ছেলের চোখে ভয় ফুটে ওঠে-সময়ে সময়ে শরীরে কাঁটা দেয়। ওই নদীর সাতনরী হার আরও নিচে গিয়ে এক হয়ে মিশেছে। তখন আর নদীর এপার ওপার নাই। মা-লক্ষ্মীর গলার সোনার সাতনরী হয়ে উঠেছে যেন মনসার গলার অজগরের বেড়; নদী সেখানে অজগরের মতই ফুসছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফুলে ফুলে উঠছে, যেন হাজার ফণা তুলে দুলছে। এরই মধ্যে কখনও ওঠে আকাশে টুকরো খানেক কালো মেঘ-দেখতে দেখতে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যায় তার উপর, যেন কেউ আগুনে-গড়া হাতের আঙুলের ঘা মেরে বাজিয়ে দেয় ওই কালো মেঘের ‘বিষমঢাকি’র বাজনা। যে বাজায় তার মাথায় জটার দোলায় আকাশ-পাতাল দুলতে থাকে। অজগর তখন তার বিরাট অঙ্গ আছড়ে আছড়ে হাজার ফণায় ছোবল মেরে নাচে-কুঁসিয়ে ফুঁসিয়ে মাতনে মাতে। নদীর জলে তুফান জাগে। সে তুফানে বাড়ি ঘর গ্রাম-গোলা-গঞ্জ বন্দর-মানুষ গরু কীটপতঙ্গ সব ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়। আবার তুফান নাই, ঝড় নাই, বাইরে দেখতে-শুনতে সব শান্ত স্থির, কোথাও কিছু নাই।–হঠাৎ নদীর ধারের গ্রামের আধখানা কঁপতে লাগল, টলতে লাগল-দেখতে দেখতে কান্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল অজগরের মত নদীর অথৈ গর্ভে। মানুষকে সেখানে বার মাস এক চোখ রাখতে হয় আকাশের কোলে-কালো মেঘের টুকরোর সন্ধানে আর এক চোখ রাখতে হয় সবুজ ঘাসে-ফসলে-ঢাকা চন্দনের মত মাটির বুকের উপর-ফাটলের দাগের খোজে-ভাবনা সেখানে বার মাসই বটে।
…আংশিক

