জ্যানথিপি

মানব সুরত

ক্রিটোর বাড়িতে অনুষ্ঠিত জ্ঞানসভায় নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করে নিজগৃহে ফিরলেন মহামতি সক্রেটিস। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরটাকে আজ খুব বেশি বোঝা মনে হচ্ছে তাঁর। শরীরেরই বা কী দোষ! নশ্বর শরীর তো আর অবিনশ্বর জ্ঞানচর্চার মতো অজর-অক্ষয় নয়। শরীরের লয় আছে, ক্ষয় আছে, ভয় আছে; শরীরের পুষ্টি প্রয়োজন, যত্ন প্রয়োজন, বিশ্রাম প্রয়োজন। সে-সব না পেলে শরীর তো খারাপ হবেই। আহা, মানুষের শরীরটি যদি বায়বীয় হতো, কিংবা দেবী দিমিটারের কৃপায় শুধু আলো আর বাতাস থেকে পুষ্টি নিয়েই শরীর আপনাআপনি বেড়ে উঠতো, তাহলে দুষ্টু অর্কিস থেকে অর্কিডের জন্ম না হয়ে সক্রেটিস থেকে সক্রেটিড নামক নরম গুল্ম-বৃক্ষের জন্ম হতো! আহা, কতোই না ভালো হতো তবে! এসব ভাবতে ভাবতেই সক্রেটিসের ঠোঁটের কোনায় এক অপার্থিব হাসি ফুটে উঠলো, চিন্তাটি বেশ তৃপ্তিদায়ক, তিনি কিছুটা শান্তি অনুভব করলেন।

সক্রেটিস শোবার ঘরে ঢুকলেন। ধীর পায়ে ঘরের কোনায় রাখা মলিন চেয়ারটিতে গিয়ে বসলেন তিনি। তারপরেই শুনতে পেলেন ত্রস্ত পায়ে কারো এগিয়ে আসার শব্দ এবং বাজখাই হুংকার।

— সাহেবের আসার সময় হলো বুঝি! তা, আসার দরকার কী ছিলো? বাহিরে থেকে গেলেই তো পারতে!

স্ত্রী জ্যানথিপির কথা গায়ে মাখলেন না তিনি। এ আর নতুন কী! শুধু মৃদু গলায় বললেন— হ্যালো, সুইটহার্ট, জ্যানু সোনা, কিছু খেতে দাও। খুব ক্ষিধে পেয়েছে।

মেজাজ সবসময়ই তিরিক্ষি হয়ে থাকে জ্যানথিপির, তার উপর স্বামীর খাবারের অনুরোধ শুনে ধৈর্য হারালেন তিনি।

— তো মহাশয়, ঘরে তো অনেক খাবার, আপনাকে কোনটি দিবো? আজকে খুব সুন্দর সুন্দর শব্দের ভাত রান্না করেছি। সাথে জ্ঞানের সালুন, তত্ত্বের চচ্চড়ি, দর্শনের রোস্ট, সাধু সাধু ঝোল আর প্রশ্নের দোপেঁয়াজা, আপনার কোনটি চাই বলুন?

মহামতি সক্রেটিস কিছুই বললেন না, চেয়ারে বসেই আলতো করে চোখ বুজলেন এবং আনমনে বলে উঠলেন— জ্ঞানের রাজ্যে যাঁরা পরিব্রাজক, তাঁরা মূলত অলিম্পাসের উত্তরাধিকার। জ্ঞানের মতো তাঁরাও অমর-অক্ষয়। জ্যানথিপি, তুমিও অমর হবে। তবে সেটা অভিধানের পাতায়। সেখানে তুমি হবে অজ্ঞানতা ও অধিভোগের সমার্থক, কলহপ্রিয়া মুখরা রমণীর পরিচায়ক!

(সব চরিত্র বাস্তব, ঘটনাসমূহ কাল্পনিক)