স্মৃতিপত্র

মানব সুরত

(গ্রন্থ: ধ্রুপদের জলছাপ)

কী সব দিন ছিল আমার!
ঐশ্বর্যময় সদাশয় একেকটি মোদক দিন।
পট্টময় সময়ের ভাঁজ থেকে
আলতো করে খুলে আসতো দিনগুলো।

সেইসব দিনগুলোতে আমরা ছিলাম
একই প্রতিশ্রুতির ছায়াতলে।
একই স্বপ্নের ঘেরাটোপে ছিল আমাদের বসতবাটি।
একই নিকানো উঠোন পাড়ি দিয়ে
বার-বাড়ির নুইয়ে পড়া হিজলের বন
তার দুরন্ত যৌবনের মোহন মৌতাতে এঁকে দিয়েছিল
আমাদের কামনার মায়াবী আলপথ।
আর সে পারিজাত পথে হেঁটে হেঁটে
অমলিন পুকুরের বুক জুড়ে ভেসে থাকা
থোকা থোকা হিজলের ফুল আঁকড়ে ধরে—
আমরা আমাদের অনুভূতিগুলো গেঁথেছিলাম নিপুণ নকশায়।
সেইসব সোনালি দিন ছিল আমার!

আমি বলতাম—ভাসাব
অমনি তুমি ভাসতে হাসির কলকলে।
আমি বলতাম—সুর চাই
অমনি তোমার কন্ঠে সঙ্গত করতো হাজারটা সরোদ, তানপুরা।
আমি বলতাম—সাজাব
অমনি তুমি সাজতে পাতারঙা সবুজ শাড়িতে
কপালে আলতো টিপ, বাহুলতায় খোরাসানি নকশা।

কী সব দিনই না ছিল আমার!

তুমি রিকশা পছন্দ করতে বলে
আমি ঠিক করেছিলাম—
বিবাহযাত্রা হবে রিকশায় চড়ে।
তুমি ভেলা পছন্দ করতে বলে
আমি ঠিক করেছিলাম—
পদ্মার বুকে কলাগাছের ভেলায় সাজাবো বাসর।
তুমি চা পছন্দ করতে বলে
আমি পুরো পৃথিবীটাকেই চায়ের বাগান বানাবো বলে
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

দোয়েলচত্বর দিয়ে যেতে যেতে তুমি বলতে, ‘কী সুন্দর’!
আমি বলতাম—
আমাদের মিলনের রাতে ওরাই বাজাবে সানাই।

কী সব দিন ছিল আমার!

পার্কের ঘাসের গালিচার শয্যা, তারা-ফোঁটা আকাশের ছাদ
ভীষণ পছন্দ আমার।
তাই তুমি সবুজ আঁচল বিছিয়ে বানাতে শয্যা
তোমার তারা-ফোঁটা চোখের ভেতর
সীমাবদ্ধ করেছিলে আমার আকাশকে।
আমার পছন্দ ছিল শুক্লা দ্বাদশীর রাত
মিশাধারের ভেতর জোনাকীর আলোর উৎসব।
তাই অমাবস্যার রাতেও তুমি জ্বালিয়ে দিতে শুক্লা দ্বাদশীর প্রদীপ।
কাঁপাকাঁপা আলোয় তোমার উদ্ভাসিত মুখ দেখে
আমি হতবাক পৃথিবীর ভাষাহীন একমাত্র প্রেমিক!

আমি যখন কাঁঠালচাঁপার গন্ধ-লোভে চষে ফেলতাম
সমস্ত বাগান, ফুল, বাতাসের সৌরভ—
তুমি তখন তোমার বুকের ভেতর থেকে
বের করে দিতে একটি গোলাপ
আমি তোমার নিঃশ্বাসে পেতাম কাঁঠালচাঁপার গন্ধ।

কী সব দিন ছিল আমার !

আমি বলতাম—কাঁপাবো সমাজ, ভাঙবো নিয়ম।
তুমি বলতে, ‘না’।
আমি বলতাম—ভীতু তুমি।
বুকের ভিতর থেকে খুলে ফেলো দ্বিধার আঙরাখা।
হাসতে তুমি। আমি দেখতাম—
তোমার দু’চোখে জড়িয়ে আছে টলটলে অশ্রু।
গন্ড বেয়ে ঢল নামবার আগেই
মহাপবিত্র ভেবে সে অশ্রু তুলে নিয়ে লাগাতাম চোখে—
আমার দৃষ্টি ফিরে পেতো নব-যৌবন।

যখন তুমি আমাকে ছুঁয়ে যেতে—
আমার দু’চোখের তারায় তখন তোমারই ধ্যান!
তোমার ছোঁয়ায় ‘প্রিন্স অব পার্সিয়া’র মতো জীবন বাড়তো আমার।

আমাদের স্বপ্ন ছিলো—মাটির পৃথিবীতে স্বর্গ নামাবো আমরা।
তাই তোমাকে বুকে নিয়ে দু’চোখ বুজে
প্রতিটি গভীর প্রশ্বাসে পেতাম সেই সুখ।

কী সব দিন ছিল আমার !

আমাদের রাশিরাশি সুখ আর অসীম স্বপ্নকে সাক্ষী রেখে
ভালোবাসার উন্মুক্ত পঞ্জিকার ত্রিবেণী সঙ্গমে
আমি আমার ঠিকুজীগুলো মিলাতে চেয়েছিলাম
তোমার জীবনকোষ্ঠির সাথে!
তুমি চেয়েছিলে তোমার আত্মার কাঁপনকে
আমার অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে দিতে!
আমাদের যুগল ভাবনার মিহি বুননে স্বপ্ন সাজিয়ে
আমরা দু’জনেই চেয়েছিলাম—
আমাদের পথ স্তম্ভিত হোক ভালবাসার মোহনায়!

কী সব দিনই না ছিল আমার!
পৃথিবীর তাবৎ ঐশ্বর্যের বিনিময়েও
সেইসব দিনের স্মৃতি বিকাতে রাজি নই আামি।

এমনই সব দিন ছিল আমার!
ঐশ্বর্যময় সদাশয় একেকটি মোদক দিন।
পট্টময় সময়ের ভাঁজ থেকে
আলতো করে খুলে আসতো দিনগুলো।

সেইসব সোনালি দিন ছিল আমার!