মানুষ আজ অমানবিক ঈশ্বর

মানব সুরত

(গ্রন্থ: মগ্ন মহাকাল)

(দুর্ভিক্ষপীড়িত সন্তানকে স্তন্যদানের চেষ্টায় হাড্ডি-চর্মসার অজানা এক মায়ের উদ্দেশ্যে)

মা, ওরা বলে এটা নাকি ঈশ্বরের ইচ্ছে
‘পাপ’ নামক কিছু একটার অমোঘ প্রায়শ্চিত্ত!
মা, পাপ কী? কোন পাপ? কার পাপ?
পাপ কি তবে আমার বর্তমান, আমার ভবিষ্যত?
পাপ কি তোমার কোলে আমি শিশু সন্তান?
পাপ কি হাড্ডিসার দেহ নিয়ে বেঁচে থাকা?
পাপ কি মায়ের বুকে সন্তানের অভুক্ত শয্যা?
পাপ কি কোনো ধর্মগ্রন্থ, রাষ্ট্রনীতি?
পাপ কি স্বয়ং ঈশ্বর, মা?

হায়, কোন পাপীর ঔরসে জন্মালো এই পাপ!

নাস্তিকেরা বলে, এটা ঈশ্বরহীনতার প্রমাণ।
আস্তিকেরা বলে, এতে ঈশ্বর আছে—তা-ই বোঝা যায়।

নাস্তিকেরা সাম্যবাদী ঈশ্বর চায়—
ঈশ্বর মানুষের জন্যে হোক, মানবতার হোক!
ঈশ্বর দর্শনে হোক, বিজ্ঞানে হোক, যুক্তিতে হোক!
নিধার্মিক অন্তর ঈশ্বরের মাঝে খুঁজে ফেরে
পরম অভিভাবকত্ব আর বাৎসল্য রস,
অনিকেত-আশ্রয় সাথে অপয়া অনিষ্টের মুক্তি।
কিন্তু, মেলে না।
…হায়, ঈশ্বর নেই!

আস্তিকেরা অদৃশ্য ও অদৃষ্টের অনুদাস,
জানে— ঈশ্বর সর্বময় ক্ষমতাবান প্রশংসাপ্রেমী
স্বর্গ ও নরকের স্রষ্টা, অহর্নিশ লীলাকার!
ভয় এবং লোভ— ঈশ্বরের দুই কাঁধ, ধরে রেখেছে
পৃথিবী, আরাধ্য পূণ্য, বর্জিত পাপ, স্বর্গ-নরক।
ঈশ্বরের দায় নেই, সব দায় মানুষের।
মানুষ বিভক্ত— অসম অসদৃশ
টুকরো টুকরো পাথরের মতো বিভক্ত।
সমাজ-সংসার-তত্ত্ব-জ্ঞান-পথ-পাথেয়-সম্পদ-সম্পর্ক
সব বিভক্ত। আর সেই বিভক্তির প্রাসাদে
ঈশ্বরের বিভক্ত অধিষ্ঠান-অহংকার-অন্ধ মৌনতা!

মা, ঈশ্বর কী? আমি ঈশ্বর চিনি না!
মা, ধৈর্য কী? আমি ধৈর্য চিনি না!
মা, ঈমানী পরীক্ষা কী? আমি ঈমান চিনি না!
মা আমি ক্ষুধা চিনি, তৃষ্ণা চিনি, প্রচণ্ড তৃষ্ণা
আর আগ্রাসী ক্ষুধায় তোমার চর্মসার স্তনের
দুগ্ধহীনতা চিনি, নুন-ঘামের স্বাদ চিনি, গন্ধ চিনি।

মা, আমি কি মানুষ? আমি কি এই মানুষ?
তাহলে মানুষ কোথায়? ওরাই কি ওই মানুষ?

ওই মানুষেরা অর্থ সভ্যতা বুর্জোয়া রাজনীতি,
এই মানুষেরা তার জ্ঞানের কর্ষিত জমিন।
ওই মানুষেরা মন মনন শিল্প শিশ্ন মানবিক বেনিয়া,
এই মানুষেরা তার উপাখ্যান-উপজীব্য।
ওই মানুষ আর এই মানুষ
—মাঝখানে উন্মুক্ত আকাশ রক্তাক্ত ধূসর!

এই সবুজ পৃথিবী
আর মানবিক চারপাশ আজ হিংসার দখলে।
হিংসা কি স্বার্থের ঈশ্বর? স্বার্থ কি ক্ষমতার?
তাহলে ক্ষমতাই কি ঈশ্বর? ক্ষমতাই কি ধর্ম?

মা, আমি ধর্ম বুঝি না, ঈশ্বর বুঝি না, মানুষ বুঝি না।
তোমার হাড্ডিসার কোল আমার স্বর্গ-আশ্রয়, তোমার
অপুষ্ট স্তনের শুকনো রুক্ষ স্তনবৃন্তই শুদ্ধ মানবতা।
মা, তুমিই আমার ঈশ্বর, আমার ধর্ম, আমার একমাত্র মানুষ!

হায়, মানবিক মানুষও আজ অমানবিক ঈশ্বর!